বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ২৯ নভেম্বর ২০১৮

প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর উদ্ধোধনী মঞ্চায়ন


প্রকাশন তারিখ : 2018-11-23

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রত্ননাটক করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এরই ধারাবাহিকতায় আড়াই হাজার বছরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’ মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড. সেলিম মোজাহার-এর রচনায় এবং লিয়াকত আলী লাকীর নির্দেশনায় প্রযোজনাটির উদ্ধোধনী মঞ্চায়ন ২৩ নভেম্বর বগুড়ার মহাস্থানগড় ভাসু বিহাওে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামীকাল ২৪ নভেম্বর একই স্থানে ২য় মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হবে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমি প্রযোজিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই প্রত্ননাটকটি তিনশতাধিক শিল্পী-কলাকুশলীর অংশগ্রহণে নির্মিত প্রতœনিদর্শন মহাস্থানগড়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপন।

প্রত্ননাটক মহাস্থান২৩ নভেম্বর ২০১৮ সন্ধ্যা ৬টায় মঞ্চায়নের উদ্ধোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ, প্রধান অতিথি হিসেব উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মঞ্চসারথি নাট্যজন আতাউর রহমান, বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক আবদুস সেলিম, প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, বগুড়া জেলার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ, বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূইঞা বিপিএম এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. বদরুল আনম ভূঁইয়া।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘বগুড়া আমার খুব প্রিয় শহর। বগুড়ার মাটি যেমন উর্বর এর সংস্কৃতির ইতিহাসও অনেক পুরনো। মহাস্থান হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান তিনটি সভ্যতার শিল্প পিঠস্থান। এই স্থানকে নিয়ে নির্মিত নাটকটি বিশেষ গুরুত্ববহ।’

মহাস্থান নাটকে আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে সময়ের পরম্পরায় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত সময়কালকে একক গ্রন্থনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই নাটকে প্রাচীন শিকারযুগ থেকে শুরু করে বৈদিকযুগ, আদিবাসি পর্ব, রামায়নের গীত, কালিদাসের কাব্য, চর্যাপদ, সুফিসামা, বৈষ্ণব পদাবলী, ব্রাহ্মসংগীত, লোকগান, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ব্রতচারীদের গান, পঞ্চকবির গান, ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস, কাব্য-গীত ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা পালাগানরূপে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাস ঐতিহ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি আমাদের যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের আলোকিত অধ্যায় রয়েছে, সেটাই মহাস্থান নাটকের মধ্যদিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন সময়ের নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছিলো। ‘মহাস্থান’ প্রতœনাটকের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন সময়ের শাসন শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থানটি একসময় ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও পরণত হয়েছিলো। ধর্মের বাণী বুকে নিয়ে কেউ মানবতার কথা বলেছেন কেউ আবার মানুষের অধিকার নষ্ট করেছেন। এসব কীর্তি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ‘মহাস্থান’ নাটকে। এ প্রসঙ্গে নাটকটির নির্দেশন লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘ পৃথিবীতে এভাবে আর্কিও ড্রামার ইতিহাস নেই। এর কাজ প্রতœ-ইতিহাসকে দুশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করে শিল্পে রূপ দেয়া। মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমগ্র বাঙলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প। মহাস্থান, কোটি বছরজুড়ে এ-মটির জেগেওঠার কথা। হাজার হাজার বছর ধরে তার মানব বসতির কথা।’ নাট্যকার সেলিম মোজহার বলেন, ‘বাঙলার প্রাচীনতম রাজধানী পুন্ড্রনগরের ‘মহাস্থন’কে কেন্দ্রভূমিতে রেখে-মহামুনি গৌতম বুদ্ধের বাঙলায় আগমনকাল থেকে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ কালব্যক্তির এ-নাট্য-আখ্যানে পুরো গল্পটাকে এক সাথে বলার চেষ্টা হয়েছে। বাঙ্গালা অঞ্চলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পট ও তার পরিবর্তনের ইতিহাসের ‘জানা ও জনপ্রিয়’ গল্পপ্রবাহ এ-নাটকের অখ্যানভাগ।

এই নাট্য প্রযোজনা নির্মাণের অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ‘প্রতœ আর্ট ক্যাম্প ২০১৮’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ জন চিত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে দিনব্যাপী মহাস্থানের ১০টি স্থানে এই আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। আর্ট ক্যাম্পে শিল্পীরা মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন স্থাপনার ক্যানভাস পেইন্টিং ও স্কেচ করেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ইতোপূর্বে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর স্থাপনা নিয়ে দুইটি প্রত্ননাটক মঞ্চস্থ করেছে। গত ২০ এপ্রিল ২০১৪ নওগাঁস্থ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে দেবাশীষ ঘোষের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছিলো দেশের প্রথম প্রত্ননাটক ‘সোমপুর কথন’। নরসিংদী জেলার উয়ারী বটেশ্বর খননের মাধ্যমে যে আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে, সেই নিদর্শনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে মঞ্চনাটক ‘উয়ারী-বটেশ্বর’। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ৬ জুন ২০১৪ নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়।

মঞ্চায়ন সবার জন্য উন্মুক্ত। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে বগুড়াবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে আগ্রহী শিল্পী, সংগঠক, গণমাধ্যমকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রদর্শনীর মঞ্চায়নে উপস্থিত থাকবেন। প্রদর্শনী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ফেসবুক পেইজে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এছাড়া বগুড়ার ভাসু বিহারে মঞ্চায়নস্থলে পৌছানোর জন্য বগুড়া শহর থেকে বাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বেলা ৩:৩০টায় বগুড়া সাতমাথার জিলা স্কুলের সামনে থেকে এবং বগুড়া প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বাস যাত্রা করবে।

এই আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরতে বগুড়া জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে ২২ নভেম্বর সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এই আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরেন বক্তব্য দিয়েছেন প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর নির্দেশক ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।


Share with :

Facebook Facebook