বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১৭ অক্টোবর ২০২০

‘বিশ্ব মানবতার মুক্তিতে লালন দর্শন’-এই আহ্বানের মধ্যদিয়ে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সাধুমেলা


প্রকাশন তারিখ : 2020-10-17

lalon 5মহাত্মা ফকির লালন শাহ্ এর ১৩০তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ১৬ ও ১৭ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সাধুমেলা-২০২০ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। আয়োজনে দেশি ও বিদেশি লালন গবেষকগণ ভার্চুয়াল ও স্বশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন ইউনেস্কো ঢাকা অফিস। এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকাসহ ৬৪ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে একযোগে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন ১৭ অক্টোবর সকাল ৯টায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাউল গান ও বাউল দর্শন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল ৩টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। স্বগত বক্তব্য প্রদান করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক সুশান্ত কুমার সরকার। সেমিনারে বিশ্ব মানবতার মুক্তিতে লালন দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. শক্তিনাথ ঝা (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। লালন চর্চার ইতিহাস সংরক্ষণে আমাদের করণীয় বিষয় ভিত্তিক বক্তব্য প্রদান করেন অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল করিম। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান এবং উপস্থিত আলোচকদের শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি। 

বাংলাদেশ সরকার ও ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ সংরক্ষণ ও প্রসার বিষয়ক বক্তব্য প্রদান করেন কিষী তাহ্নিন, প্রোগ্রাম অফিসার (কালচার), ইউনেস্কো, ঢাকা অফিস। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় লালন সাঁইজির গান: শুদ্ধবাণীর অনুসন্ধান ও সাম্প্রতিককালের পরিবেশনরীতির পর্যালোচনা করেছেন নাট্যকার ও গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া।

 সাঁইজির ভাববাণী ‘যে খানে সাঁই বারাম খানা…’ পরিবেশন করেন টুনটুন ফকির; ‘সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা…’ গানটি পরিবেশন করেন শিল্পী শফি মন্ডল; ‘শিরনি খাওয়ার লোভ যার আছে…’ গানটি পরিবেশন করেছেন শিল্পী পাগলা বাউল। ‘বাড়ির পাশে আরশিনগর…’ গানটি পরিবেশন করেন কয়োকো তাকাদা (জাপান)। এছাড়া লালন সংগীত পরিবেশন করেন সুগাত মৈত্র (শ্রীলঙ্কা)। সন্ধ্যা ৬টা থেকে একাডেমি প্রাঙ্গণ বাউলকুঞ্জে সাঁইজির ভাববাণী পরিবেশিত হয়।

গত ১৬ অক্টোবর ২০২০ সকাল ৯টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বাউলকুঞ্জ থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর পর্যন্ত শত বাউলের অংশগ্রহণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। সকাল ১০টায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাউল গান ও বাউল দর্শন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল ৩টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘বিশ্ব মানবতার মুক্তিতে লালন দর্শন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়েল মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব কে এম খালিদ এমপি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী এর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. নওসাদ হোসেন। অনলাইনে যুক্ত হয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাউন্সিল ফর সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট এর সভাপতি অধ্যাপক মুচকুন্দ দুবে (নয়াদিল্লী, ভারত)। আলোচনা করেন ইনালকো বিশ্ববিদ্যায় (ফ্রান্স) অধ্যাপক জেরিমি করডম এবং জনাব কার্লোস সেমিডো, (গবেষক, ফ্রান্স)।

বিষয় ভিত্তিক আলোচনায় বাউল সঙ্গীত সংরক্ষণ ও বিকাশ বিষয়ক বক্তব্য রাখেন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারী জেনারেল জনাব মো. সোহেল ইমাম খান, লালনের সমাজ ভাবনা ও বিশ্ব মানবতা বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। সাঁইজির ভাববাণী পরিবেশন করেন ফকির নহির শাহ্, ফরিদা পারভীন, সমির বাউল, কিথ ই কান্ত (ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র) এবং দেবরা জান্নাত (ফ্রান্স)। সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমি প্রাঙ্গণ বাউলকুঞ্জে বিশিষ্ট ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাঁইজির ভাববাণী ও বাউল গান অনুষ্ঠিত হয়। 

আলোচনার আগে জাতীয় পর্যায়ের বাউল শিল্পীদের পরিবেশনা ‘এলাহি আলমিন গো আল্লাহ, বাদশা আলম বনা তুমি…’ দিয়ে সেমিনার শুরু হয়। সেমিনারে বক্তাদের আলোচনার পাশাপাশি শিল্পীরা বাউল সংগীত পরিবেশন করেন। বাউল শিল্পী লতিফ শাহ গেয়েছেন ‘ডুবে দেখ দেখি মন কি রুপ লিলাময়…’; শিল্পী ফরিদা পারভিন গেয়েছেন ‘পাখি কখন যেন উড়ে যায়…’। ফ্রান্স বংশদ্ভুত দেবরা জান্নাত গেয়েছেন ‘বাড়ির পাশে আরশি নগর…’; বাউল সাধক নহির শাহ গেয়েছেন গুরু পদে নিষ্ঠা মন যার হবে। ‘আমার এ ঘর খানায় কে বিরাজ করে’- গানটি পরিবেশন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংগীত দল এবং ‘এসো হে দয়ার কন্ডারি…’ গানটি পরিবেশন করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বাউল দল।lalon day 2 2

 

মানবতার মহান সাধক ফকির লালন সাঁই ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার অন্তর্গত চাপাড়া, ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধক, দার্শনিক ও মানবতাবাদী কবি। প্রাপ্তি সূত্রে তিনি প্রায় সহস্রাধিক মরমি ভাববাণীর রচয়িতা। তাঁর মর্মস্পর্শী পদাবলি বাংলার সহজ সরলমনা সংগীীত প্রেমীদের আত্মার খোরাক। তাঁর গান গেয়ে অনেক শিল্পী বাংলাদেশ ও ভারতে জনপ্রিয়তা লাভসহ বহির্বিশ্বেও খ্যাতি অর্জন করেছেন । দেশে ও দেশের বাইরে মুক্তিকামী অসংখ্য মানুষ লালন ফকিরের ভাববাণীকে নিজ জীবনের ভাবাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করছেন কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তাঁর স্মরণে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে কোনো কর্মকান্ড বা আয়োজন প্রচলিত ছিল না। এ শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শিল্পগুরু ঋদ্ধিমান লিয়াকত আলী লাকী দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে তাঁর ভাবনা ও পরিকল্পনায় দেশের বরেণ্য বাউল ও বাউল শিল্পী, শীর্ষ পর্যায়ের লালন গবেষক, প্রাজ্ঞ সাধক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে  জাতীয় পর্যায়ে ২০১৫ সালে তিন দিনব্যাপী কয়েক শতাধিক সাধক নিয়ে সাধুসঙ্গ, ২০১৬ সালে লালন সাঁইজির আখড়ায় দেশের বরেণ্য সাধকদের দ্বারা কয়েক শত নবীন প্রবীণ বাউল ঘরানার শিল্পীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক মহোদয়ের ভাবনা ও পরিকল্পনায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাউল দল গঠন করে, প্রশিক্ষণরত বাউলদের ২০১৭ থেকে অদ্যাবদি দেশের প্রথম শ্রেণির বাউল সাধক ও বাউল শিল্পীদের দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য ২০১৯ সাল থেকে প্রতিমাসের পূর্ণিমা তিথিতে মাসিক “সাধুমেলা আয়োজন করে আসছে।

বিশ্বব্যাপী (কোভিড -১৯) করোনা মহামারীর কারণে পূর্বের ন্যায় একাডেমির বাউলকুঞ্জে সাধুমেলার আয়োজন করা সম্ভব না হলেও এর ধারাবাহিকতা অনলাইনে প্রতিমাসে আয়োজন ও সম্পন্ন করা হয়ে থাকে (সাধুমেলার ১৩ থেকে ১৮তম আসর) এর মধ্যে ১৪তম ও ১৬তম সাধুমেলা তিন দেশের অংশগ্রহনে আন্তর্জাতিকভাবে সুসম্পন্ন করা হয়।

 

Share with :

Facebook Facebook